Sunday, June 16, 2024
spot_img
spot_img
Homeজেলাআর্থিক সঙ্কটের সঙ্গে লড়াই করেও বাবা ও মায়ের জেদ উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম স্হানে...

আর্থিক সঙ্কটের সঙ্গে লড়াই করেও বাবা ও মায়ের জেদ উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম স্হানে পৌঁছে দিল ছেলে শুভ্রাংশুকে

অশোক বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতা: প্রতি ঘরে বাবা ও মা য়েদের মনে একটা সুপ্ত স্বপ্ন বাস করে গোপনে। সে পুত্র হোক কিংবা কন্যা তাকে শিক্ষা দীক্ষা দিয়ে মানুষের মতো মানুষ করে তোলার জন্য। সচ্ছল বাবা মায়েদের সেই স্বপ্ন পূরণের কোনও অসুবিধা নেই। কিন্তু গরীব, যাঁদের দিন আনা দিন খাওয়ার সংসার সেই সব মা ও বাবাদের স্বপ্ন সফল করতে গেলে অনটনকে নিত্যসঙ্গী করে চলতে হয়।

আর্থিক সঙ্কটের সঙ্গে লড়াই করেও বাবা ও মায়ের জেদ উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম স্হানে পৌঁছে দিল ছেলে শুভ্রাংশুকে

সারেঙ্গাবাদ এর তাপস ও শম্পা সর্দার দম্পতির জীবন তাই। কিন্ত তাদের জেদ এর কাছে হার মেনেছে অনটন। কারণ তাঁদের একটাই লক্ষ্য আর্থিক সঙ্কটের সঙ্গে লড়াই করেও নিজের আত্মজকে মানুষ করে তোলা। তাই সকাল থেকে বিকেল একটি লড়ঝড়ে তিন চাকার মালবাহী গাড়ি তে কখনও সব্জি কখনও পাথর বয়ে দিয়ে আসা। বিনিময়ে যা পাওয়া যায় তা সংসার ও সন্তানের শিক্ষায় সংযতভাবে খরচ করা।

আর্থিক সঙ্কটের সঙ্গে লড়াই করেও বাবা ও মায়ের জেদ উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম স্হানে পৌঁছে দিল ছেলে শুভ্রাংশুকে

তার সুফল ছেলে শুভ্রাংশু তথা ঋকের উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম হওয়া। যা গোটা রাজ্যের মানুষ এদিন জানতে পারল।সারেঙ্গাবাদ হাইস্কুল থেকে বজবজ ট্রাঙ্ক রোড পার হয়ে ঠিক উল্টো উত্তর দিকের রাস্তাটি হল শিবতলা রোড। অচেনা এই রাস্তাটি নিয়ে এতদিন কেউ মাথা ঘামায়নি। কিন্ত বুধবার দুপুর থেকে মহেশতলা পুরসভার ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের এই শিবতলা রোড নিয়ে পুলিস, কাউন্সিলর থেকে শুরু করে এলাকার গণ্যমান্যরা তো বটেই এর সঙ্গে মিডিয়া থেকে খোঁজ চলতে থাকে লাগাতার।

আর্থিক সঙ্কটের সঙ্গে লড়াই করেও বাবা ও মায়ের জেদ উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম স্হানে পৌঁছে দিল ছেলে শুভ্রাংশুকে

মুখে মুখে চর্চা চলে এই রাস্তা নিয়ে। আসলে এই রাস্তা দিয়ে ৬০০ মিটার গেলেই পাওয়া গেল উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যের ভিতর প্রথম স্হানাধিকারী শুভাংশু সর্দার তথা ঋকের বাড়ি। পৈতৃক ভিটের একতলা র ছোট একটি ঘর। ঘরের দেওয়ালে র পলেস্তার খসে পড়েছে। নীচতলার ছোট একটি ঘর। উপরতলায় কাকারা থাকেন। সিঁড়ির তলায় কোনও ভাবে রান্নার জায়গা করা হয়েছে।

আর্থিক সঙ্কটের সঙ্গে লড়াই করেও বাবা ও মায়ের জেদ উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম স্হানে পৌঁছে দিল ছেলে শুভ্রাংশুকে

এদিন উচ্চমাধ্যমিকের ফল যখন ঘোষণা হয়, তখন ঋক নরেন্দ্র পুর রামকৃষ্ণ মিশন আবাসিকে ছিল। তাঁর বাবা সজল তথা তাপস সর্দার ও মা শম্পা সর্দার ফল কি হতে পারে তার অপেক্ষায় ছিলেন। উৎকন্ঠা ছিল। ফলে সারা রাত এই দম্পতি ভালো করে ঘুমোতে পারেননি। এদিন সকালে ভাড়া খাটতে গাড়ি নিয়ে বার হননি। তাঁরা জানতেন ঋক এক থেকে দশের ভিতর কোনও একটা স্হান পেতে চলেছে।

আর্থিক সঙ্কটের সঙ্গে লড়াই করেও বাবা ও মায়ের জেদ উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম স্হানে পৌঁছে দিল ছেলে শুভ্রাংশুকে

কিন্ত একেবারে প্রথম তা কখনও ভাবেননি। আসলে তাদের এই একটি মাত্র ছেলেকে নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সংসারে যুদ্ধ চলছে। কারণ খুব একটা সচ্ছল নন এই সর্দার দম্পতি। তাপসবাবু র রোজগারের একমাত্র উপায় হল একটি তিন চাকার মালবাহী ছোট গাড়ি। তাও তা অনেক পুরাতন। এই গাড়ি নিয়ে ভাড়া খাটেন। কখনও সব্জি কখনও পাথর নিয়ে যান। গাড়ির চালক তিনি।

আর্থিক সঙ্কটের সঙ্গে লড়াই করেও বাবা ও মায়ের জেদ উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম স্হানে পৌঁছে দিল ছেলে শুভ্রাংশুকে

কি গরম কি শীত কি বর্ষা সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাড়া খাটতে বেরিয়ে পড়েন। রোজ ভাড়া পাবেন এমন নিশ্চয়তা নেই। এই ভাড়া থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে টেনেটুনে সংসার আর ছেলে ঋকের পড়াশুনার খরচ চালান। এত পরিশ্রম এর জন্য শারিরীক অসুবিধা হয়। কিন্ত ছেলেকে বড় করতে হবে এই স্বপ্নকে সফল করার জন্য সব অসুবিধা চুপ করে সহ্য করেন। কেউ জানতেও পারেনা।

আর্থিক সঙ্কটের সঙ্গে লড়াই করেও বাবা ও মায়ের জেদ উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম স্হানে পৌঁছে দিল ছেলে শুভ্রাংশুকে

করোনার আগে শুভ্রাংশু তথা ঋকের মা শম্পা দেবী একটি প্রাইভেট সংস্থায় কাজে যোগ দিয়েছিলেন। করোনার দাপট বেড়ে যাওয়ার জন্য তাঁর কাজ চলে যায়। ফলে তারপর থেকে গৃহস্হ কাজ নিয়ে আছেন। ঋকের খুড়তুতো কাকা একই বাড়ির চৌহিদ্দির ভিতর থাকেন। তাঁর নাম জয়ন্ত সর্দার। তিনি এর আগের টার্মে মহেশতলা পুরসভার এই ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর ছিলেন।

আর্থিক সঙ্কটের সঙ্গে লড়াই করেও বাবা ও মায়ের জেদ উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম স্হানে পৌঁছে দিল ছেলে শুভ্রাংশুকে

তিনিও এদিন খুব উচ্ছসিত ভাইপোর এই ফল শুনে। বললেন ওর বাবা মানে আমার ভাই তাপস খুব কষ্ট করে সংসার চালাচ্ছে। একেবারে কাছ থেকে দেখে আসছি। আমাদের এই সর্দার পরিবারের এখানে সাতপুরুষ এর বাস। আমাদের হাড়ি আলাদা হলেও পরস্পরের সঙ্গে সকলের সখ্যতা আছে। তাপসের একটি সন্তান। ছোট থেকে ঋক শান্ত ও পড়াশুনার দিকে ঝোঁক দেখেছি।

আর্থিক সঙ্কটের সঙ্গে লড়াই করেও বাবা ও মায়ের জেদ উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম স্হানে পৌঁছে দিল ছেলে শুভ্রাংশুকে

আমার ভাই ওই একটা ছোট গাড়ি চালিয়ে সামান্য রোজগার করলেও ছেলেকে মানুষ করার দিকে নজর থাকতো। তাপসের একটা বড়গুণ হল ওর আত্মসম্মান খুব। কারও কাছে হাত পাততে দেখিনি। আমি কাউন্সিলর ছিলাম। কখনও আমার কাছে আসেনি কোনও অনুরোধ নিয়ে। বিশেষ করে ছেলের জন্য। যদি কাউন্সিলর হিসেবে আমি কখনও পরিবারের কাউকে কোনও সুযোগ দিতে চাইতাম না। দিই নি।

আর্থিক সঙ্কটের সঙ্গে লড়াই করেও বাবা ও মায়ের জেদ উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম স্হানে পৌঁছে দিল ছেলে শুভ্রাংশুকে

তাপস একটা নার্সারি তে ওর ছেলেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়িয়েছে। প্রতিটি ক্লাসে প্রথম হয়েছে। এই ফল দেখে তাপস ঠিক করে ছেলেকে রামকৃষ্ণ মিশনে রেখে পড়াবে। কিন্ত এজন্য খরচ অনেক। সেই একটা মালবাহি গাড়িকে সামনে রেখে এই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এত পরিশ্রমের ফল এখন স্পন্ডিলাইটিস ধরা পড়েছে। কিন্ত ছেলেকে বড় করার স্বপ্ন এই ব্যাধিকে আড়ালে রেখে দিয়ে এগোচ্ছে তাপস।

আর্থিক সঙ্কটের সঙ্গে লড়াই করেও বাবা ও মায়ের জেদ উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম স্হানে পৌঁছে দিল ছেলে শুভ্রাংশুকে

ঋকের কাকিমা নিবেদিতা সর্দার ও খুড়তুতো বোন স্নেহা সর্দার ও দাদার এই ফল শুনে খুশী। স্নেহা এখন দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়া। বললো দাদা আমার চেয়ে এক বছরের বড়। কিন্তু এই সর্দার বাড়ির ভিতর একেবারে আলাদা। পড়াশুনা থেকে শান্ত স্বভাবের। বই ছাড়া কিছু চেনে না। তবে ছুটিতে বাড়িতে এলে মিশন ও এখানকার বিষয় নিয়ে গল্প করে। এদিন ছেলের ফল শুনে তাপসবাবু ত তাঁর স্ত্রী শম্পা দেবী খুব খুশী।

আর্থিক সঙ্কটের সঙ্গে লড়াই করেও বাবা ও মায়ের জেদ উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম স্হানে পৌঁছে দিল ছেলে শুভ্রাংশুকে

তাঁরা বলেন, ভাল ফল করবে জানতাম। কারণ মিশনের মহারাজ রা এ নিয়ে বলতেন। তবে প্রথম হবে ভাবিনি। এবার ছেলে কোন দিকে এগোতে চায় তা ছেলের ভাবনার উপর ছেড়ে দিয়েছেন সর্দার দম্পতি। তবে যতদূর যেতে চায় কষ্ট হলেও ছেলের হাত ধরে এগিয়ে দিতে চান তাঁরা। ভাল ফল করার পর ঋকের মায়ের কাছে আবদার হল ভাল ভাল বই কিনে দিতে হবে। আর কিছু নয়।

Html code here! Replace this with any non empty raw html code and that's it.

Most Popular

error: Content is protected !!