Wednesday, July 24, 2024
spot_img
spot_img
Homeজেলাহিমালয়ের মৌমাছি আর সুন্দরবনের খলসে ফুল 'তরল সোনার' উৎস

হিমালয়ের মৌমাছি আর সুন্দরবনের খলসে ফুল ‘তরল সোনার’ উৎস

বান্টি মুখার্জি, ক্যানিং: নাওয়া-খাওয়া ভুলে দল বেঁধে প্রত্যন্ত সুন্দরবনের জঙ্গলে মধু সংগ্রহের জন্য প্রস্তুতি শুরু করেছেন মৌলেরা (মধু সংগ্রহকারী)।আগামী এপ্রিল থেকে সুন্দরবন জঙ্গলে মধু সংগ্রহের কাজ শুরু হবে। সময় নষ্ট করতে রাজি নয় সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকার মধুসংগ্রাহক মৌলেরা। চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। মূলত এপ্রিল মাসকে মধুমাস বলা হয়।

হিমালয়ের মৌমাছি আর সুন্দরবনের খলসে ফুল 'তরল সোনার' উৎস

এপ্রিলের ঠিক আগের মুহূর্তে হিমালয় থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছিরা আসে। এই মৌমাছি চেহারায় বেশ বড়। প্রায় এক-দেড় ইঞ্চি লম্বা হয়। এই পাহাড়ি মৌমাছির নাম ডাঁশ। এরা লোকাল মাছি কিংবা মৌমাছিকে অনায়াসেই আক্রমণ করে মেরে ফেলে। ‘খলসে’ গাছের ফুলও এই সময় ফোটে। মূলত সেই ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করার জন্য কোটি কোটি মৌমাছির আগমন ঘটে হিমালয় থেকে সুন্দরবনের গহীন অরণ্যের জঙ্গলে।

হিমালয়ের মৌমাছি আর সুন্দরবনের খলসে ফুল 'তরল সোনার' উৎস

আবার সমগ্র পৃথিবীতে যত বাদাবন জঙ্গল রয়েছে, তার মধ্যে একমাত্র সুন্দরবনের জঙ্গলে খলসে গাছ জন্মায়। পৃথিবীর অন্যত্র কোনও জঙ্গলে জন্মায় না খলসে ফুল গাছ। খলসে ফুলের গন্ধ বড়ই মধুময়। সমগ্র সুন্দরবনের ১৯টি ব্লকের মধ্যে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় ১৩টি এবং উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় ৬ টি। আবার বনবিভাগের নিয়ম অনুযায়ী ২২টি ব্লকের (বন্যপ্রাণী দ্বীপ) ১১৫টি ঘন জঙ্গল এলাকায় মধু পাওয়া যায়।

হিমালয়ের মৌমাছি আর সুন্দরবনের খলসে ফুল 'তরল সোনার' উৎস

চলতি মধুর সিজন এপ্রিল মাসে প্রায় ৪০০ জন মৌলে সুন্দরবনের জঙ্গলে রওনা দেবেন মধু সংগ্রহের জন্য। খলসে ফুলের মধু অত্যন্ত সুস্বাদু হয়। অন্যান্য ফুলের মধু সামান্য হলেও তিতা হয়। বনদপ্তর মৌলেদের কাছ থেকে সংগৃহীত মধু কিনে নিয়ে শোধন করে ‘মৌবন’ নামে বাজারে বিক্রি করে। সুন্দরবনের মধু আবার ‘জিআই’ তকমা পেয়েছে। মৌলেদের সংগৃহীত মধু বন দফতর ৩০০ টাকা কেজি দরে কিনে নেবে।

হিমালয়ের মৌমাছি আর সুন্দরবনের খলসে ফুল 'তরল সোনার' উৎস

মধু সংগ্রহের সময় যদি বাঘের আক্রমণে কোনও মৌলে মারা যান, তাঁর জন্য দু’লক্ষ টাকার বিমা রয়েছে। এছাড়াও মধু চুরি এবং জলদস্যুদের মোকাবিলা করার জন্য রয়েছে বাহিনী।বিপদসঙ্কুল প্রত্যন্ত সুন্দরবনের জঙ্গল থেকে মধু (সুন্দরবনের তরল সোনা) সংগ্রহ অন্যতম প্রধান জীবিকা মৌলেদের। গ্রামবাসী, জেলে-মৌলেরা ৭-৮ জনের এক-একটি দল পৃথক ভাবে মধু সংগ্রহ করতে জঙ্গলে নামে। এই কাজে যাওয়ার আগে গ্রামে সাড়ম্বরে ‘বনদেবী’ (বনবিবি), ‘দক্ষিণ রায়’ পুজো ‘দুখে যাত্রা’র আয়োজন করে।

হিমালয়ের মৌমাছি আর সুন্দরবনের খলসে ফুল 'তরল সোনার' উৎস

দক্ষিণ রায়ের ডেরা থেকে সুস্থ, অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসার জন্য গৃহস্থের মহিলারা উপবাস করে স্নান করেন।সুচিবস্ত্রে দেবীর কাছে কান্নাকাটির পর মানত করেন। পরে হাতে পুরোহিতকে দিয়ে লাল সুতো আর মাদুলি-তাবিজ-কবচ পরানো হয়। জঙ্গলের উদ্দেশে রওনা কিংবা বিদায়বেলায় চোখের জল ফেলা নিষিদ্ধ! সংসারের প্রিয়জন জঙ্গল থেকে কবে বাড়িতে ফিরবেন,

হিমালয়ের মৌমাছি আর সুন্দরবনের খলসে ফুল 'তরল সোনার' উৎস

সেই অপেক্ষায় নদীর পাড়ে পথ চেয়ে বসে থাকেন পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। বাড়িতে একমাত্র দেবীর পুজো ছাড়া সমস্ত রকম আমোদ-প্রমোদ আনন্দ বন্ধ থাকে। এছাড়াও বাড়ির গৃহবধুরা শাঁখা, সিঁদুর পরা, কাপড় কাচা বন্ধ রাখেন। বাড়িতে আত্মীয় বন্ধুবান্ধব এলে বসার জন্য আসন দেওয়া হয় না। কথা বলা বন্ধ। এমনকী কেউ পানীয় জল খেতে চাইলেও দেওয়া হয় না। তবে দিনের বেলায় সমস্ত নিয়ম মেনে চলা হলেও সূর্যাস্তের পর আবার সমস্ত কিছুই স্বাভাবিক থাকে সূর্যোদয় পর্যন্ত।

হিমালয়ের মৌমাছি আর সুন্দরবনের খলসে ফুল 'তরল সোনার' উৎস

বাড়ির প্রিয়জন জঙ্গল থেকে বাড়ি ফিরলেই ঢাকঢোল পিটিয়ে শুরু হয় আনন্দ উৎসব পুজোপাঠ। জাঁকজমক করে বাড়ি কিংবা বনের ভিতরে গিয়ে দেবীকে পুজো করা হয়।অনেক মৌলে আবার বাঘের মুখ বাঁধা মন্ত্র জানা গুনিনকে সাথে করে নিয়ে যায় জঙ্গলে। বনের উদ্দেশে যাওয়ার আগে তাঁরা পাঁচ পিরের (মানিক পির, দরিয়া পির, সত্য পির, গোরাচাঁদ পির, কাউর পির) নামে “বদর বদর” ধ্বনি দিয়ে সকল দেব-দেবীর আশীর্বাদ নেন।

হিমালয়ের মৌমাছি আর সুন্দরবনের খলসে ফুল 'তরল সোনার' উৎস

গভীর জঙ্গলে মধুর চাক কাটার সময় নদীতে স্নান করে ভিজে কাপড়ে কোনও এক গাছের গোড়ায় গরান পাতার থালা তৈরি করে গুড়ের বাতাসা দিয়ে পুজো করেন। এরপর গুনিন জঙ্গল বেঁধে দেওয়ার পর শুরু হয় উড়ন্ত মৌমাছির গতিবিধি লক্ষ্য করে মৌচাক খোঁজার পালা। আবার সঙ্গীরা নিরাপদে আছে কি না, তা জানান দিতে কিছুক্ষণ পর পর “ক—–ক——ক—–” ধ্বনি শব্দে খেয়াল রাখেন একে অপরের।

হিমালয়ের মৌমাছি আর সুন্দরবনের খলসে ফুল 'তরল সোনার' উৎস

সাড়া-শব্দ না পাওয়া গেলেই ধরে নেওয়া হয় যে তাঁকে বাঘে নিয়ে গিয়েছে কিংবা কোনও বিপদে পড়েছেন। বেগতিক বুঝে মুহূর্তে কাজ বন্ধ করে দেন সকলেই। এলাকাটি খুবই বিপজ্জনক বোঝাতে সাথে থাকা লাল গামছা গাছে বেঁধে চিহ্ন করে দিয়ে ফিরে আসেন গ্রামে।

হিমালয়ের মৌমাছি আর সুন্দরবনের খলসে ফুল 'তরল সোনার' উৎস

আবার অনেক সময় সঙ্গীরা লাঠীসোঁটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন বাঘের উপর। দক্ষিণ রায়ের সাথে লড়াই করে সঙ্গীকে উদ্ধার করেও আনেন। এমন ঘটনার কথা শুনে অন্যান্য মৌলেরা সেইদিন মধু সংগ্রহের কাজ বন্ধ করে দেন।

হিমালয়ের মৌমাছি আর সুন্দরবনের খলসে ফুল 'তরল সোনার' উৎস

নৌকায় ফিরে রাতেই বনদেবী ও দক্ষিণ রায়ের নামে বন্দনা করে সকল মৌলের মঙ্গল কামনা জানিয়ে গাছের পাতায় মধুর নৈবেদ্য সাজিয়ে পুজো করেন। পর দিন আবার শুরু হয় মধুর চাক খুঁজে মধু সংগ্রহ।

Html code here! Replace this with any non empty raw html code and that's it.

Most Popular

error: Content is protected !!