Tuesday, February 27, 2024
Homeজেলাসুন্দরবনের রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ অথৈ জলে, আশায় বুক বাঁধছে মানুষ

সুন্দরবনের রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ অথৈ জলে, আশায় বুক বাঁধছে মানুষ

বান্টি মুখার্জি, ক্যানিং: প্রায় ১৫ বছর আগে সুন্দরবনে রেলপথ সম্প্রসারণের জন্য মাতলা সেতুর উপর শুধুমাত্র রেলব্রিজ তৈরির জন্য বেশ কিছু পিলারের কাজ হয়ে থমকে রয়েছে। থমকে রয়েছে ক্যানিং থেকে ঝড়খালি পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ। গত কয়েক বছর ধরেই বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে।

সুন্দরবনের রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ অথৈ জলে, আশায় বুক বাঁধছে মানুষ

রেল মন্ত্রক সূত্রে জানানো হয়েছে, ক্যানিং থেকে ঝড়খালি পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণের জন্য সার্ভের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ না হলে বৃহৎ এই প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। যার ফলে এই প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের দায়িত্ব দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি রেল মন্ত্রকের। যদিও রেলের তরফ থেকে এমন কোনও নির্দেশ আসেনি বলে দাবি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসনের।

সুন্দরবনের রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ অথৈ জলে, আশায় বুক বাঁধছে মানুষ

ফলে কবে এই রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ পুনরায় শুরু হবে, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। ২০০৮ সালে তৎকালীন লোকসভার অধ্যক্ষ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের হাতে সুন্দরবনে রেলপথ সম্প্রসারণের জন্য সুন্দরবনবাসী তাঁদের আবেদন পত্র তুলে দিয়েছিলেন। তৎকালীন রেলমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদবের কাছে এ বিষয়ে লিখিত আবেদন করে সুন্দরবনে রেলপথ সম্প্রসারণের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছিলেন সোমনাথবাবু।

সুন্দরবনের রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ অথৈ জলে, আশায় বুক বাঁধছে মানুষ

২০০৯ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী হওয়ার পর সুন্দরবনবাসীর আবেদন মেনে ক্যানিং থেকে সুন্দরবনের ক্যানিং-ভাঙনখালি ও পরে ঝড়খালি পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণের জন্য প্রকল্প ঘোষণা করেন। পরবর্তী রেল বাজেটে এই কাজের জন্য অর্থ বরাদ্দও করেন তিনি। মাতলা নদীর উপর সেতু নির্মাণের কাজ দিয়ে শুরু হয় এই রেল সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ।

সুন্দরবনের রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ অথৈ জলে, আশায় বুক বাঁধছে মানুষ

প্রায় ১৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে মাতলা নদীর উপর শুধুমাত্র গোটা কুড়ি কংক্রিটের পিলার তৈরি ছাড়া গত ১৫ বছরেরও বেশি সময়ে আর কোনও রকম কাজের অগ্রগতি হয়নি। যদিও ২০১৮ সালের জুলাই মাসে রেল দপ্তরের তরফ থেকে এ বিষয়ে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে, মাতলা নদীর উপর রেলসেতু তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ক্যানিং থেকে ঝড়খালি পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের জন্য সার্ভের কাজও সম্পন্ন হয়েছে।

সুন্দরবনের রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ অথৈ জলে, আশায় বুক বাঁধছে মানুষ

কিন্তু এই প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ প্রয়োজন। আর সেই জমি অধিগ্রহণের জন্য দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসনকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। যদিও রেল মন্ত্রকের এই দাবি মানতে নারাজ দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন।
বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে বৃহত্তম ব-দ্বীপ সুন্দরবন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমতলে অবস্থিত হলেও নদীনালা বেষ্টিত সুন্দরবনে যোগাযোগের সমস্যা রয়েছে প্রথম থেকেই।

সুন্দরবনের রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ অথৈ জলে, আশায় বুক বাঁধছে মানুষ

২০১১ সালে মাতলা নদীর উপর সেতু নির্মাণ করে তৎকালীন বাম সরকার সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষকে সড়কপথের মাধ্যমে যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। কিন্তু সমগ্র সুন্দরবনের মানুষ দাবি তুলেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় রেলপথের। সেই দাবি মেনে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ হয়ে রয়েছে ক্যানিং ঝড়খালি রেল সম্প্রসারণের কাজ।

সুন্দরবনের রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ অথৈ জলে, আশায় বুক বাঁধছে মানুষ

বিশেষ করে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার এই প্রকল্পের জন্য আট বছরের বেশি সময়ে একটি টাকাও বরাদ্দ করেনি। ফলে এগোয়নি এই প্রকল্পের কাজ।সুন্দরবন অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে তাই ট্রেন ধরার জন্য সুন্দরবনের গদখালি, ঝড়খালি, সরবেড়িয়া থেকে আসতে হয় সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার বা সিংহদুয়ার ক্যানিংয়ে। এই এলাকার মানুষজন চাইছেন, অতি শীঘ্রই রেল সম্প্রসারণের কাজ শুরু হোক।

সুন্দরবনের রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ অথৈ জলে, আশায় বুক বাঁধছে মানুষ

এ বিষয়ে সুন্দরবনে রেল সম্প্রসারণের প্রধান উদ্যোক্তা প্রাক্তন সুন্দরবন উন্নয়ন পর্ষদের সদস্য লোকমান মোল্লা বলেন, ২০০৮ সাল থেকে এই রেল সম্প্রসারণ নিয়ে লড়াই করছি আমরা। বিগত কেন্দ্রীয় সরকারের রেল প্রতিমন্ত্রী অধীর চৌধুরী, রেল প্রতিমন্ত্রী সুরেশ প্রভু থেকে শুরু করে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার ও কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রীর কাছে দরবার করেছি। চিঠি দিয়েছি প্রধানমন্ত্রীর দফতরেও।

সুন্দরবনের রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ অথৈ জলে, আশায় বুক বাঁধছে মানুষ

কী কারণে থমকে সেটাও অঞ্জাত। আমাদের বিশ্বাস, সুন্দরবনবাসীর দাবি মেনে রেল সম্প্রসারণ ঘটবে সুন্দরবনের বুকে। আর যদি তা না হয়, তাহলে আগামী দিনে সুন্দরবনবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আমরা পথে নামবো।
অন্যদিকে, প্রাক্তন মন্ত্রী সুভাষ নস্কর দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সুন্দরবনের বুকে একাধিক ব্রিজ স্থাপন করে সুন্দরবনের এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যাওয়ার পথ সুগম করে দিয়েছিলেন।

সুন্দরবনের রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ অথৈ জলে, আশায় বুক বাঁধছে মানুষ

তৎকালীন রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বললেন, আমিও কাজ করতে পারি। তড়িঘড়ি মাতলা নদীর উপর রেলব্রিজের কাজ শুরু করে দিলেন। বর্তমানে সেই রেলব্রিজের কয়েকটি পিলার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সরকারের কোটি কোটি টাকা নষ্ট হয়েছে।বাসন্তীর বিজেপি নেতা বিকাশ সরদার জানিয়েছেন, রেলব্রিজ কেন, কোনও উন্নয়ন বাংলায় করতে পারেনি তৃণমূল। শুধু চপ শিল্প, খেলা শিল্প, কাটমানি নিয়ে শেষ করে দিয়েছে বাংলাকে।

সুন্দরবনের রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ অথৈ জলে, আশায় বুক বাঁধছে মানুষ

রেলব্রিজের জন্য কেন্দ্র টাকা দিলেও রাজ্য সরকারের দায়িত্ব জমি অধিগ্রহণ করা। ফলে রাজ্য সরকারের গাফিলতিতেই রেলব্রিজ আটকে রয়েছে। বর্তমানে বাসন্তীর বিধায়ক হয়েছেন শ্যামল মণ্ডল। তিনি এত বেশি উন্নয়ন করেছেন যে, ক্যানিং পশ্চিমের মানুষ তাঁকে প্রত্যখ্যান করেছে। এবার বাসন্তীর বিধায়ক হয়েছেন, শুধুই প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন। পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে।তাছাড়া আমি চ্যালেঞ্জ করে বলছি, যদি উন্নয়ন করতে হয়, রেলব্রিজ করে দেখিয়ে দিন। সেটা কিন্তু তিনি পারবেন না।

সুন্দরবনের রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ অথৈ জলে, আশায় বুক বাঁধছে মানুষ

বাসন্তীর বিধায়ক শ্যামল মণ্ডল বলেছেন, কেন্দ্রের গাফিলতিতেই বঞ্চিত হচ্ছে বাংলা, বঞ্চিত হচ্ছে সুন্দরবন। বিগত রেল বাজেটে মাতলা রেলসেতু নিয়ে মাত্র এক টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। যাতে করে প্রকল্পটি ঠান্ডাঘরে পাঠিয়ে দেওয়া যায়। তবে সুন্দরবনের মানুষ যাতে উপকৃত হয়, তার জন্য আগামী দিনে আমরা রেলব্রিজ নিয়ে কেন্দ্রের কাছে দরবার করব।

সুন্দরবনের রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ অথৈ জলে, আশায় বুক বাঁধছে মানুষ

অন্যদিকে, ক্যানিং পশ্চিমের বিধায়ক পরেশ রাম দাস জানিয়েছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন রেলমন্ত্রী ছিলেন, তখন মাতলা ব্রিজের কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। পরবর্তীকালে মুকুল রায় যখন রেলমন্ত্রী ছিলেন, তখনও বেশকিছু কাজের অগ্রগতি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী কালে কেন্দ্রীয় সরকরার এবং রেলমন্ত্রীকে একাধিকবার জানানো সত্ত্বেও রেল সম্প্রসারণের কাজ হয়নি। থমকে পড়ে রয়েছে।’

সুন্দরবনের রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ অথৈ জলে, আশায় বুক বাঁধছে মানুষ

রাজনৈতিক সমীকরণের জন্য না সুন্দরবনবাসীদের অবহেলিত পথে ঠেলে দেওয়ার জন্য ক্যানিং-ঝড়খালি রেলপথ সম্প্রসারণে কাজ থমকে গিয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। যদিও সমগ্র সুন্দরবনবাসী অধীর অপেক্ষায় চাতকের মতো তাকিয়ে কবে সুন্দরবনের বুকে রেলপথ সম্প্রসারণে কাজ শুরু হবে।

Most Popular

error: Content is protected !!