Saturday, March 2, 2024
Homeজেলাপিয়ালির তীরে প্রাচীন মন্দির সব ধর্মের মানুষের মিলনতীর্থ, সংস্কারের দাবি

পিয়ালির তীরে প্রাচীন মন্দির সব ধর্মের মানুষের মিলনতীর্থ, সংস্কারের দাবি

বান্টি মুখার্জি, ক্যানিং: বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ সুন্দরবন। সেই সুন্দরবনের দাপুটে মাতলা নদীর শাখানদী পিয়ালি। মধ্যযুগের এই পিয়ালি নদীর দুই তীরে ঘন জঙ্গল। সারি সারি হেতাল, গরান গাছ।নদীতে তখন যানবাহন বলতে একমাত্র পালতোলা নৌকাই ভরসা ছিল। পিয়ালির দুই তীরে রয়েছে তিলপি ও ধর্মতলার কচুয়া এলাকা।

পিয়ালির তীরে প্রাচীন মন্দির সব ধর্মের মানুষের মিলনতীর্থ, সংস্কারের দাবি

সেখানে কোনও মানুষের বসবাস নেই। জানা যায়, কিছু দূরেই কেল্লা জঙ্গল থেকে বাঘ ও হরিণ সুন্দরবনের এই এলাকায় বিচরণ করতে। ব্যবসার জন্য তখন এলাকার মানুষজন দূরদূরান্ত থেকে পালতোলা নৌকায় চেপে পিয়ালির বুক চিরে ধোষা বাজারে যেতেন। ধোষা বাজারের কয়েক কিলোমিটার আগেই একটি জায়গায় প্রায় প্রতিনিয়ত নৌকাডুবির ঘটনা ঘটতে। তাতে পিয়ালির বুকে বহু মানুষের সলিল সমাধি হত।

পিয়ালির তীরে প্রাচীন মন্দির সব ধর্মের মানুষের মিলনতীর্থ, সংস্কারের দাবি

জানা গিয়েছে, পিয়ালির যেখানে অহরহ নৌকাডুবির ঘটনা ঘটতে, সেখানেই আচমকা একটি মাটির উঁচু ঢিবি তৈরি হয়। নদীতে জোয়ারের জল বাড়লেও সেই ঢিবির উপর কখনও জল উঠত না। আশপাশের এলাকা জলমগ্ন হলেও উঁচু ঢিবি ছিল অক্ষত। নৌকার যাত্রীরা সেখান থেকে যাওয়ার সময় ভগবান, আল্লার স্মরণ করতেন।

পিয়ালির তীরে প্রাচীন মন্দির সব ধর্মের মানুষের মিলনতীর্থ, সংস্কারের দাবি

প্রাণে বাঁচার জন্য পিয়ালির নদীর বুকে পয়সা ফেলতেন নমস্কার করে। কখনও পরিত্রাণ পেতেন। আবার কখনও নৌকার সকল যাত্রীর পিয়ালির বুকে সলিল সমাধি হত। আরও জানা গিয়েছে, সেই সময় সেন যুগের লক্ষ্মণ সেনের নদীয়া দখল করেন ইক্তারউদ্দিন মহম্মদ বিন বক্তিয়ার খলজি। তাঁর হাত থেকে জীবন বাঁচানোর তাগিদে লক্ষণ সেন সুন্দরবনের ওই এলাকায় আত্মগোপন করেছিলেন। তবে সে সব ইতিহাস।

পিয়ালির তীরে প্রাচীন মন্দির সব ধর্মের মানুষের মিলনতীর্থ, সংস্কারের দাবি

এরই মধ্যে আশ্চর্য্যজনক ওই উঁচু ঢিবির উপর গড়ে ওঠে একটি মন্দির। সেখানে ঠাঁই হয় বনবিবি, নারায়ণী ও গঙ্গাদেবীর।নৌকাডুবি এবং জঙ্গলের বাঘ ও হিংস্র প্রাণীদের হাত থেকে বাঁচতে শুরু হয় পুজোপার্বণ। এদিকে পিয়ালি নদীকে বাগে আনতে ১৯৭৫ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায় পিয়ালি নদীর বুকে বাঁধ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

পিয়ালির তীরে প্রাচীন মন্দির সব ধর্মের মানুষের মিলনতীর্থ, সংস্কারের দাবি

সেই বাঁধ নির্মাণ হয় কেল্লা এলাকায়। বাঁধ নির্মাণের পর পিয়ালির দাপট কমে যায়। মজে যেতে থাকে পিয়ালি। এই অবস্থায় ১৯৯০ সালে আমতলার কচুয়া সংলগ্ন পিয়ালির তীর গড়ে ওঠে জনবসতি।নারায়ণী দেবীর নাম অনুসারে এলাকার মানুষের মুখে মুখে গ্রামের নামকরণ হয় নারায়ণীতলা।প্রাচীন মন্দিরে শুরু হয় পুজোপার্বণ।

পিয়ালির তীরে প্রাচীন মন্দির সব ধর্মের মানুষের মিলনতীর্থ, সংস্কারের দাবি

মন্দিরে সারাবছর পুজো হলেও, মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে মাঘ মাসের প্রথম তিনদিন মেলা বসে মন্দির সংলগ্ন এলাকায়। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের লোকজন ভিড় জমায় এই মেলায়। অনেকেই আবার প্রাচীন এই মন্দিরে মানত করেন। মানত পূরণ হলে পরের বছর পুজো দেন। এছাড়াও মন্দিরের পাশেই গড়ে ওঠে হিন্দু সৎকার শ্মশান। এলাকায় কোনও শ্মশান না থাকায় তা গড়েছেন এলাকার বাসিন্দা পঞ্চানন মণ্ডল ও শচীপদ ভুঁইয়া।

পিয়ালির তীরে প্রাচীন মন্দির সব ধর্মের মানুষের মিলনতীর্থ, সংস্কারের দাবি

বর্তমানে প্রাচীন এই মন্দিরটি ভগ্নদশায় বিলীন হতে বসেছে। এলাকার মানুষের দাবি, প্রাচীন এই মন্দিরকে যদি সরকার কিংবা কোনও সহৃদয় সংস্থা বা ব্যক্তি সংস্কার করেন, তাহলে প্রাচীন মন্দিরটি রক্ষা পাবে।
এলাকার যুবক রথীন মিস্ত্রী বলেন, ঠাকুরদার কাছে গল্প শুনেছিলাম, কোনও এক মুসলিম ব্যক্তি মন্দিরটি তৈরি করেছেন। তাঁর একটি মামলা চলছিল। মন্দিরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মানত করেছিলেন, মামলায় জিতলে মন্দির তৈরি করে দেবেন।

পিয়ালির তীরে প্রাচীন মন্দির সব ধর্মের মানুষের মিলনতীর্থ, সংস্কারের দাবি

তিনি আদালতে গিয়ে জানতে পারেন মামলার ফলাফল নিষ্পত্তি হয়ে তিনি জয়ী হয়েছেন। সেই মুসলিম ব্যক্তিই মন্দির তৈরি করেছিলেন বলে পূর্বপুরুষের কাছে গল্প শোনা। তবে কে সেই মুসলিম ব্যক্তি, তা আজও অজানা।
প্রাচীন মন্দির সম্পর্কে এলাকার বাসিন্দা ইয়াহিয়া আখন্দ জানিয়েছেন, বাপ ঠাকুরদার আমল থেকে শুনে আসছি এই মন্দিরের রহস্য। তবে কে বা কারা এই মন্দির তৈরি করেছেন, তা অজানা।

পিয়ালির তীরে প্রাচীন মন্দির সব ধর্মের মানুষের মিলনতীর্থ, সংস্কারের দাবি

তবে আমরা পূর্বপুরুষের কাছে জেনেছি, এই নারায়ণী মন্দির খুবই জাগ্রত। একসময় ইক্তার উদ্দিন মহম্মদ বিন বক্তিয়ার খলজির হাত থেকে প্রাণ বাঁচানোর জন্য লক্ষ্মণ সেন এখানে আত্মগোপন করেছিলেন। এই মন্দির হিন্দু-মুসলিম পরিবারের কাছে এক অন্যতম মিলনতীর্থ স্থান। মন্দিরটির সংস্কারের জন্য প্রায় ৪৫ বছর আগে গ্রামীণ মেলা শুরু হয়।

পিয়ালির তীরে প্রাচীন মন্দির সব ধর্মের মানুষের মিলনতীর্থ, সংস্কারের দাবি

মেলায় তেমন আয় না হওয়ায় মন্দির সংস্কার হয়নি। ভগ্নদশায় পড়ে রয়েছে। প্রাচীন মন্দিরটির সংস্কারের জন্য যদি কোন সংস্থা, সংগঠন কিংবা রাজ্য সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে ভালোই হয়।এলাকার বছর তিরাশির বৃদ্ধ শচীপদ গায়েন বলেন, রহস্যময় পৌরাণিক মন্দিরটির সংস্কারের কাজে হাত লাগিয়েছি ঠিকই,

পিয়ালির তীরে প্রাচীন মন্দির সব ধর্মের মানুষের মিলনতীর্থ, সংস্কারের দাবি

কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের জেরে তা থমকে রয়েছে।
পিয়ালি তার ঐতিহ্যের দাপট হারালেও রহস্যেঘেরা প্রাচীন এই মন্দির পিয়ালির তীরে আজও নিদর্শন হিসাবে এলাকার সর্বধর্মের মানুষের হৃদয়ে রয়ে গিয়েছে।

Most Popular

error: Content is protected !!