Friday, March 1, 2024
Homeজেলাবাল্যবিবাহ রুখে পুরস্কৃত মৌসুনীর দুই স্কুল পড়ুয়া

বাল্যবিবাহ রুখে পুরস্কৃত মৌসুনীর দুই স্কুল পড়ুয়া

রবীন্দ্রনাথ মমণ্ডল, নামখানা: কেবল শারীরিক ব্যাধি নয়, সামাজিক ব্যাধিও যে কত ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা অল্প বয়সে বুঝে গিয়েছিল দক্ষিণ ২৪ পরগনার মৌসুনী কো-অপারেটিভ হাই স্কুলের দুই পড়ুয়া, মৌসুনীর পয়লাঘেরির বাসিন্দা অঞ্জুশ্রী প্রধান ও মৌসুনীর কুসুমতলার বাসিন্দা অর্জুন মাঝি।

বাল্যবিবাহ রুখে পুরস্কৃত মৌসুনীর দুই স্কুল পড়ুয়া

সেই সময় অঞ্জুশ্রীর বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। সবে মাত্র অষ্টম শ্রেণিতে পা রেখেছে সে। কিন্তু সামাজিক দায়বদ্ধতা তাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল জীবনসংগ্রাম। সমাজের নারীশক্তি ও নারীদের বেঁচে থাকার লড়াই তাকে প্রায়ই আন্দোলিত করত। ঠিক সেই সময় থেকে অঞ্জুশ্রী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সামাজিক ব্যাধি থেকে নারীদের মুক্তি করতে।

বাল্যবিবাহ রুখে পুরস্কৃত মৌসুনীর দুই স্কুল পড়ুয়া

তার বুদ্ধিতে রক্ষা পেয়েছে একজন ছাত্রী। নিজের সাহসিকতার জেরে এসেছে একের পর এক সাফল্য। বর্তমানে অঞ্জুশ্রী মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। তার এই সাহসিকতা ও মানসিকতাকে কুর্নিস জানিয়েছে রাজ্য সরকার। এবারের শিশু দিবসে রাজ্য সরকারের বিশেষ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছে অঞ্জুশ্রী।

বাল্যবিবাহ রুখে পুরস্কৃত মৌসুনীর দুই স্কুল পড়ুয়া

রাজ্য শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনের পক্ষ থেকে বীরাঙ্গনা সম্মান দেওয়া হয় অঞ্জুশ্রীকে। নামখানা ব্লকের বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ মৌসুনী। এই দ্বীপের বাসিন্দা অঞ্জুশ্রী। এই এলাকার অন্যতম সমস্যা হল বাল্যবিবাহ ও নারী পাচার। অভাবের সুযোগ নিয়ে কমবয়সি মেয়েদের পাচার করে দেওয়া হয়।

বাল্যবিবাহ রুখে পুরস্কৃত মৌসুনীর দুই স্কুল পড়ুয়া

অনেকেই আবার কম বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসে যায়। পরিবারের মদতে চলে এরকম বেআইনি কাজ। বাল্যবিবাহ ও নারী পাচার রুখতে এই এলাকায় কাজ শুরু করে রূপান্তরণ ফাউন্ডেশন। এই সংস্থার কর্মীরা স্কুলপড়ুয়াদের নিয়ে তৈরি করে শিশু সুরক্ষা কমিটি। সেই কমিটির সদস্যরা সহপাঠী বা পরিচিতদের কম বয়সের মধ্যে বিয়ে বা পাচারের খবর পেলে জানাত সংস্থার কর্মীদের।

বাল্যবিবাহ রুখে পুরস্কৃত মৌসুনীর দুই স্কুল পড়ুয়া

এভাবে বছরখানেক আগে অঞ্জুশ্রীর এক সহপাঠীকে বিয়ে দেওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করেন পরিবারের লোকজন। বিষয়টি অঞ্জুশ্রী জানতে পেরে সহপাঠীর পরিবারের লোকজনকে বিয়ে বন্ধ করার জন্য বোঝাতে থাকে। কিন্তু সহপাঠীর পরিবার প্রথমে রাজি হয়নি। এরপর সংস্থার মাধ্যমে স্থানীয় থানার দ্বারস্থ হয় অঞ্জুশ্রী ও তার সহপাঠী।

বাল্যবিবাহ রুখে পুরস্কৃত মৌসুনীর দুই স্কুল পড়ুয়া

অবশেষে পুলিশের হস্তক্ষেপে বন্ধ হয় সেই বিয়ে। অঞ্জুশ্রীর সেই সহপাঠী এখন স্কুলে যাচ্ছে।অঞ্জুশ্রী বলে, আমার লক্ষ্য সমাজের ব্যাধিগুলিকে দূর করা। আমি আজ পুরস্কার পেয়ে আনন্দিত হয়েছি। কিন্তু এর থেকে ও বেশি আনন্দিত হব যেদিন সমাজ থেকে ব্যাধিগুলি পুরোপুরি নির্মূল হবে।গত ইয়াস ঝড়ে অঞ্জুশ্রীদের মাটির বাড়ি ভেঙে গিয়েছিল।

বাল্যবিবাহ রুখে পুরস্কৃত মৌসুনীর দুই স্কুল পড়ুয়া

তারপর থেকে সংসারের হাল ধরতে ও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে ভিন রাজ্যে পাড়ি দেয় অঞ্জুশ্রীর বাবা দেবব্রত প্রধান। অঞ্জুশ্রীর মা খুকু প্রধান বলেন, মেয়ের এমন কাজে আমরা গর্বিত। আগামী দিনে মেয়ের পাশে আমরা সব সময় থাকব।
অঞ্জুশ্রীর কাজে খুশি তার সহপাঠীরাও। অঞ্জুশ্রীর সহপাঠী পারমিতা করন বলে, ওর কাজে আমরা গর্বিত।

বাল্যবিবাহ রুখে পুরস্কৃত মৌসুনীর দুই স্কুল পড়ুয়া

ওর কাছ থেকে আমরা উৎসাহ পাচ্ছি। আগামী দিনে ওর সঙ্গে আমরা একসঙ্গে রুখে দাঁড়াব।অপরদিকে, অর্জুনকে জেলার বীরপুরুষ সম্মানে পুরস্কৃত করা হয়। অর্জুনের প্রতিবেশী এক স্কুলছাত্রী প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি প্রতিবেশীরা এবং ওই স্কুল ছাত্রীর পরিবারের লোকজন জানতে পারেন।

বাল্যবিবাহ রুখে পুরস্কৃত মৌসুনীর দুই স্কুল পড়ুয়া

প্রতিবেশীরা বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকেন ওই ছাত্রীর পরিবারকে। বিয়ের ব্যবস্থাও করে ওই স্কুলছাত্রীর পরিবার। কম বয়সে বিয়ে হচ্ছে দেখে অর্জুন রুখে দাঁড়ায়। বন্ধ হয় বিয়ে।বর্তমানে আবারও স্কুলে যাচ্ছে ওই ছাত্রী।অর্জুনের বাবা অভিজিৎ মাঝি পেশায় কৃষক ও মা জ্যোৎস্না মাঝি গৃহকর্মী।

বাল্যবিবাহ রুখে পুরস্কৃত মৌসুনীর দুই স্কুল পড়ুয়া

এ বিষয়ে মৌসুনী কো-অপারেটিভ হাইস্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিনয় সী বলেন, ওদের জন্য আমরাও গর্বিত। ওরা স্কুলের মুখ উজ্জ্বল করেছে। এই অল্প বয়সে পড়াশোনার বাইরে সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় দিয়েছে ওরা। রূপান্তরণ ফাউন্ডেশনের কর্মী দীপালি দাস বলেন, ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সি মেয়েদের নিয়ে আমরা শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠন করেছি।

বাল্যবিবাহ রুখে পুরস্কৃত মৌসুনীর দুই স্কুল পড়ুয়া

মাসে দু’বার এদের নিয়ে বৈঠক করি। সেই বৈঠক থেকে সমাজের খারাপ দিকগুলির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে শেখাই। বাল্যবিবাহ ও নারী পাচার সুন্দরবনের অন্যতম বড় সমস্যা। আমরাও আজ গর্বিত। ভবিষ্যতে অঞ্জুশ্রী ও অর্জুনের মতো সবাই এগিয়ে এলে সামাজিক ব্যাধিগুলি দূর হবে। সমাজ বদলাবে। সমাজের চিন্তাধারা বদলাবে।

Most Popular

error: Content is protected !!