Friday, March 1, 2024
Homeকলকাতাআন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব: ফরিদপুর থেকে আসা স্কটিশের সেই যুবকটির গোটা জীবনটাই খন্ড...

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব: ফরিদপুর থেকে আসা স্কটিশের সেই যুবকটির গোটা জীবনটাই খন্ড খন্ড ছবি, নিজের হাতে তৈরি বিভিন্ন ছবিতে তা তিনি বলে গিয়েছেন

বিমল বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: পরাধীন অবিভক্ত ভারতের পূর্ব বাংলার ফরিদপুরের এক যুবক ভিটেমাটি ছেড়ে চলে
এলেন কলকাতায়। বহিরাগত সরল সাদাসিধে সেই যুরক কলকাতায় এসে ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে ভর্তি হলে এলিট
কলেজ স্কটিশ চার্চে। সময়টা ১৯৪১ সাল। একদিন তাঁর হোস্টেলের ঘর থেকে বহিরাগত ওই যুবককে গ্রেপ্তার করল
পুলিস। কিন্তু তাঁর অপরাধ কি? বন্দে মাতরম বলেছিল? না তা নয়। আসলে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে
যুক্ত থাকার জন্য তাঁকে ধরা হল। এটাই বহিরাগত ওই যুবকের ভিতরটা বদলে গেল। ওই বছর আগস্ট মাসে আরও
একটি ঘটনা তাঁকে আরও ধাক্কা দিল। তা হল, একদিন ক্লাস চলার সময় এক অধ্যাপক এসে জানালেন, কবি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর নেই। সেই সংবাদ পেয়ে জোঁড়াসাকো থেকে নিমতলা পৌঁছে গেলেন কবির মরদেহ দেখে মনের
শ্রদ্ধা জানাবেন বলে। সেখানে ভিড়ে তিল ধারণের ক্ষমতা নেই। কবির দেহ আসবে বলে নিমতলা মহাশশ্মানে অন্য সব
দাহ কাজ বন্ধ হয়ে রয়েছে। সেই সময় ফরিদপুরের সেই যুবক দেখতে পেলেন, এক বাবা তাঁর ছেলের দেহ নিয়ে
সৎকারের জন্য দাঁড়িয়ে রয়েছে। এর ভিতর কবির দেহ চলে আসতেই, চারপাশ থেকে জনস্রোতের চাপ বাড়ল। ভিড়ের
চাপের ভিতর পড়ে গেলেন ওই বাবা তাঁর মৃত ছেলেকে নিয়ে। এক সময় দেখা গেল, বাবার হাত থেকে ছেলের দেহ ছিটকে
ভিড়ে পদদলিত হয়ে হারিয়ে গেল। তা খুঁজতে গিয়ে বাবাও সেই জনস্রোতের ভিতর নিস্পেষিত হয়ে গেলেন। এমন ভয়ঙ্কর
যন্ত্রণাময় দৃশ্য ফরিদপুর থেকে আসা সেই যুবককে এতটাই নাড়া দিয়ে গেল, যে দীর্ঘ সময় মনের ভিতর তা কুড়ে কুড়ে
খেয়েছে। কুড়ি বছর পর সেই যুবকটি একটি ছবি করেছিলেন। তার নাম দিয়েছিলেন ‘বাইশে শ্রাবণ’। সেখানে তিনি তাঁর
সেই দেখা যন্ত্রণাময় দৃশ্যটি যুক্ত করেছিলেন। আসলে ফরিদপুরের এই যুবকটি আর কেউ নন, বিখ্যাত পরিচালক
মৃণাল সেন। যাঁর ভাবনাতে সব সময় বাস্তব জীবনের সংঘাত আর সঙ্কট গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি সে কথাও বলেছেন
বিভিন্ন সময়ে। তা হল, সঙ্কটের মোকাবিলা করেই এগোতে হবে। এটাই জীবন। সেই কারণে তাঁর তৈরি ছবিইতে বিভিন্ন
সময়ের বাস্তব সঙ্কটকে তুলে ধরেছেন। মৃণাল সেনের ছবি তৈরির ধরণ ছিল একেবারে আলাদা। এই কারণে সত্যজিৎ
রায়ের মতো বিশ্ববরেণ্য পরিচালক রীতিমতো মনে মনে শ্রদ্ধা করতেন মৃণাল সেনকে। আসলে মৃণাল সেনের ভিতর
ছোটবেলা থেকেই এক প্রতিবাদী ও বিপ্লবী সত্তা কাজ করেছে। সেটাই পরবর্তী সময়ে তাঁর ছবিতে যুক্ত হয়েছে। এটা
অবশ্য পারিবারিকভাবে তিনি পেয়েছিলেন। তাঁর বাবা দীনেশ চন্দ্র ছিলেন একজন উকিল। চরমপন্থী কং দলের মুখ
বিপিনচন্দ্র পালের যে গোষ্ঠী তাঁদের ঘনিষ্ঠ। ১৯২৩ সালে মৃণাল সেনের জন্ম। তাঁরা ছিলেন বারোজন সন্তান।
বিপ্লবীদের ফাঁসির হুকুম হলে তাঁদের হয়ে লড়তেন মৃণাল সেনের বাবা। বিনা পয়সায়। বাড়িতে রাজনৈতিক কর্মীদের
আনাগোনা ছিল বেশ। মা সরযূবালা দেবী ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু ও বিপিনচন্দ্র পালের স্নেহধন্য। ইংরেজ বিরেধী সভায়
মৃণার সেনের মা উদ্বোধনী গান গাইতেন নিয়মিত। ছোটবেলায় দাঁতের ব্যাথায় যখন একদিন খুব কষ্ট পাচেছন, সেই
সময় এক সুদর্শন ডাক্তার তাঁকে এসে দেখে বলেন, ভালো হয়ে যাবে। পরে একটি মলম পাঠিয়ে দেন। অনেক পরে তিনি
জেনেছিলেন ওই ডাক্তার আসলে ছিলেন সুভাষ চন্দ্র বসু। এমন একজন সংগ্রামী স্মরণীয় ও মনে রাখার মতো
মানুষকে নিয়ে ২৯ তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচিচত্র উৎসবে তাঁর জীবন ও ছবি-র আলপনা আঁকা হয়েছে নন্দন
ওয়েভে। যা এক কথায় অন্যবদ্য। এটা দেখার জন্য কলকাতার মানুষ ভিড় করছে প্রতিদিন। আসলে মৃণাল সেনের গোটা
জীবনটাই খন্ড খন্ড ছবি। যা তিনি তাঁর সেলুলয়েডে বলে গিয়েছেন।

Most Popular

error: Content is protected !!