Tuesday, May 28, 2024
spot_img
spot_img
Homeজেলাসাংবাদিকতার নতুন রূপ দিয়েছিলেন অগ্রজপ্রতিম সাংবাদিকেরা

সাংবাদিকতার নতুন রূপ দিয়েছিলেন অগ্রজপ্রতিম সাংবাদিকেরা

গ্রামীণ সাংবাদিক হিসেবে দক্ষিণের আনন্দবাজারের অগ্রজপ্রতিম পিতৃসম সাংবাদিক অনুকূল দাসের মতো আজকালের করিমপুরের অসিতোষ বিশ্বাস খবরের কাজ করেছেন সমাজ কল্যাণের কথা মাথায় রেখে।

বিমল বন্দ্যোপাধ্যায়
এক সময় গ্রামীণ সাংবাদিক হিসেবে যাঁরা খবর সংগ্রহ করেছেন। সেই সব অগ্রজপ্রতিম পিতৃসম সাংবাদিক রা কেউ এটাকে পেশা হিসেবে দেখতেন না। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর প্রবাদ বাক্যের সঙ্গে তাঁদের কাজের মিল ছিল। দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার প্রয়াত আনন্দবাজারের সাংবাদিক অনুকূল দাস তার বড় উদাহরণ । এই জল ও জঙ্গল আর ভাটির দুর্গম জায়গাতে অনুকূলবাবুর সেই কলম কে ধরে রাখার নিরন্তর সংগ্রাম এখন অতীত। এমনই এক চরিত্র নদীয়া জেলার ভারত – বাংলাদেশ সীমান্ত তেহট্ট মহকুমার করিমপুরের আজকালের অগ্রজপ্রতিম সাংবাদিক অসিতোষ বিশ্বাস। প্রতিবাদী চরিত্র প্রয়াত অগ্রজপ্রতিম সম্পাদক প্রয়াত গৌরকিশোর ঘোষের হাতে তৈরি আজকালের জন্মলগ্ন থেকেই অসিতোষবাবু এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। করিমপুর এ একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন তিনি। স্কুল শেষ করে বাকি সময় খবরের কাজে ছুটে বেড়াতেন। আপাতমস্তক ভদ্রলোক ও সাংঘাতিক বিনয়ী। এক কথায় মাটির মানুষ। কথার সঙ্গে হাসি টা যেন আপনা থেকেই বেরিয়ে আসত। গোটা করিমপুর এ হেন লোক নেই তাঁকে চেনেন না। অতিথি আপ্যায়ননে ছিলেন দরাজ হস্ত। তিনিও এই সাংবাদিক তা থেকে পয়সা নিয়ে সংসার চালানোর কথা কখনও ভাবেননি। বরং সমাজজীবনের কল্যাণের কাজে খবর কে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন আমৃত্যু। শুধু তাই নয় , ভারত বাংলাদেশ এর খোলা সীমান্ত এ পাচার চক্র, নারী পাচার থেকে লাগাতার ডাকাতি র খবর করে তিনি করিমপুর কে রাজ্য প্রশাসন ও ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দৃষ্টি আকর্ষন এর পাশাপাশি ঘুম ছুটিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর সহযোগিতা নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে বর্তমানের মতো কাগজ করিমপুর কে গুরুত্ব দিতে থাকে। অসিতোষবাবুর ভদ্রতা বোধ ও উদার মনের আরও একটা উদাহরণ হল তাঁর একমাত্র পুত্র পিন্টু র সঙ্গে অন্য কাগজের কর্মরত সাংবাদিক দের ঘনিষ্ঠতা। বলা যায় পিন্টু তাঁর বাবার কাছাকাছি থাকার সুবাদে খবরের ব্যাপারে এতটাই উৎসাহী হয় ওঠে। সোর্স হিসেবে তিনি অনেক গোপন খবর দিয়েছেন। যা তাঁর বাবা অসিতোষ বাবু জানতেন না। আর জানলেও কিছুই বলতেন না। এ ব্যাপারেও তাঁর হাস্যমুখর প্রতিক্রিয়া হল এখন আর আজকাল সব খবর ছাপে না। কিন্তু বর্তমান তা নয়। প্রতিবাদী। মানুষ তাই বর্তমান কে পছন্দ করে। আমার ছেলে তা জানে। তাই আপনাদের খবর দেয়। এমন একজন মানুষ দু দিন আগে একেবারে নিঃশব্দে নিজের খোলস দেহটি রেখে আত্মার হাত ধরে চিরদিনের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন। ফলে নদীয়াতে কর্মসূত্রে থাকার সময় একেবারে কাছ থেকে দেখা এই ভদ্রলোকের জন্য অনেক স্মৃতি ভিড় করে আসছে। এটা বললে ভুল হবে না করিমপুর এর খোলা সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া থেকে সেখানকার আইনশৃঙ্খলা র পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার ব্যাপারে অসিতোষ বিশ্বাসের কলম আমাদের মতো জুনিয়র দের উৎসাহ দিয়েছে। এটাও ঠিক বর্তমান কাগজেও এ নিয়ে দেবদাস অধিকারী ও পরবর্তী সময়ে এই প্রতিবেদকের ভূমিকাও কিছুটা ছিল। যার পরিণতি সেখানে চারটি আলাদা থানা তৈরি হয়েছিল। অসিতোষবাবু বলতেন, বিমলবাবু আপনার লেখায় সাহসের ছোঁয়া আছে। যা আমাকে টানে। এটা আমার নেই। আমরা সব কথা সেভাবে বলতে পারিনা। কিন্তু আপনার লেখায় তা ফুটে ওঠে। তাতে পুলিশ ও প্রশাসন তৎপর থাকে। এমন কথা শুনে অস্বস্তি হত। বলতাম আপনার কাছে আমরা তুচ্ছ। তাছাড়া এই লেখার চড়া সুর সব সম্মানীয় সম্পাদক বরুণ সেনগুপ্ত মহাশয়ের অবদান। তাঁর ইচ্ছেতেই এমন প্রতিবাদী খবর ছাপা হয়। একটা কথা বলতেই হবে অসিতোষ বাবুর ছেলে পিন্টু প্রতিদিন সাহসের সঙ্গে নিজের রঙের ব্যবসা চালিয়ে আমাদের খবর যেভাবে জুগিয়েছে তা ভোলার নয়। এখন অবশ্য পিন্টু আনন্দবাজার পত্রিকার একজন সাংবাদিক । প্রথম দিকে ইচ্ছে না থাকলেও বাবার পেশাতে ফিরেছে পিন্টু। এটাও খুব ভাল।
মনে আছে ২০০১ সালের মে মাসে যখন নদীয়া থেকে বারাকপুর বদলি হল এই প্রতিবেদকের। সেই সময় কৃষ্ণনগর এ একটি বিদায় সম্বর্ধনা র আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে হাজির ছিলেন তৎকালীন ডিএম অর্ণব রায়, জেলা তথ্য আধিকারিক কৌস্তুভ তরফদার। এঁদের দুজন এখন রাজ্য প্রশাসনের উচ্চপদে কর্মরত। এছাড়াও সাংবাদিক অসিতোষ বিশ্বাস, গৌতম ধনী, কাকলি বিশ্বাস, অমিত ঘোষ, বিপ্লব দত্ত। শুভাকাঙ্খী হিসেবে ছিল সহৃদ লেখক স্বদেশ রায় এবং ক্রীড়াঅনুগত মানুষ ধ্রুববাবু। সেখানে এই প্রতিবেদকের বিদায় নিয়ে অসিতোষ দা একেবারে উচ্ছসিত ছিলেন না। বরং কথা বলতে গিয়ে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলেন। তা দেখে সত্যিই চোখে জল এসে গিয়েছিল। এরপর ব্যারাকপুর এসেও নিয়মিত যোগাযোগ হত। টেলিফোন করলেই একটু কথার পর কাঁদতেন। বলতেন কেন এইভাবে আসেন আপনারা। হুট করে চলে যান। একটু মায়াদয়া নেই কেন? কোনও জবাব দিতে পারিনি। দুদিন আগে যখন সেই অসিতোষ দা হুট করে চলে গেলেন। তখন তাঁর সেই প্রশ্ন জিভের ডগায় চলে এল। কিন্ত যাঁকে করব তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাই চোখের জলে ভেসে গেল সেই নিরুত্তর প্রশ্ন।

Most Popular

error: Content is protected !!